Thursday, March 18, 2010

তামাকে ছেয়ে গেছে বান্দরবনের লামা

আবদুল কুদ্দুস, লামা (বান্দরবান) | তারিখ: ১৯-০৩-২০১০

তামাকে ছেয়ে গেছে বান্দরবানের লামা পৌর শহর। ফসলের জমি, বাড়ির আঙিনা, পাহাড়ের ঢাল, এমনকি কোথাও এক চিলতে ফাঁকা জমি পেলেই তামাকের চাষ হচ্ছে। তামাক পাতায় ভরে গেছে মাতামুহুরী নদীর দুই তীর। পাহাড় থেকে নেমে আসা মাতামুহুরী এঁকে-বেঁকে বয়ে গেছে লামার বুক চিরে। এই নদীর মতোই সর্পিল বাঁক নিয়ে সুদূরে বিস্তৃত হয়েছে তামাক চাষের জমি। তা যেন একটি বিষধর সাপের মতোই পেঁচিয়ে ধরেছে এই জনপদকে।
লামার মাতামুহুরী ডিগ্রি কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, মাতামুহুরী নদী একসময় লামাবাসীর জন্য আশীর্বাদ ছিল। নদীতে মাছ ধরে জীবিকা চালাত স্থানীয় পাহাড়ি মানুষ। শুকনো মৌসুমে নদীর দুই তীরে জেগে ওঠা বালুচরে চলত বিভিন্ন ফসলের চাষ। এখন ফসলের জমি চলে গেছে তামাকের দখলে।
সম্প্রতি লামা পৌর শহর ঘুরে এমন কোনো ফসলের জমি চোখে পড়েনি, যেখানে ধান বা অন্য কোনো শস্যের আবাদ হচ্ছে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু তামাক আর তামাক। পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৩১ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এর চারদিকে এখানে-সেখানে চলছে তামাকের চাষ। হাসপাতালের পাশে মাতামুহুরী ডিগ্রি কলেজ। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চারদিকেও হাজার হাজার একর জমিতে তামাক চাষ হচ্ছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চিকিত্সক জানান, তামাক চাষের কুফল পাওয়া যাবে এখন। খেতের তামাক পোড়ানোর জন্য অন্তত তিন হাজার চুল্লি তৈরি হয়েছে। বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা মণকে মণ জ্বালানি কাঠ দিয়ে চুল্লিগুলোতে যখন তামাক পোড়ানো হবে, তখন বিষাক্ত ধোঁয়ায় পুরো পৌর শহর আচ্ছন্ন থাকবে। এর ক্ষতিকর প্রভাবে কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হবে স্থানীয় মানুষ।
পৌরসভার কাউন্সিলর মং হ্লা চিং মার্মা জানান, চুল্লিতে তামাক পোড়ানোর সময় বিষাক্ত রস মাতামুহুরি নদীসহ স্থানীয় খালবিলের পানি দূষিত করে। এতে মারা যায় মাছসহ নানা জলজ প্রাণী। এ কারণে নদীর মাছ অনেক কমে গেছে। দিন দিন তামাক চাষের বিস্তার ঘটায় তরিতরকারির আবাদ কমে গেছে।
লামা পৌর শহরের আমিরাবাদ হোটেলের মালিক কামাল উদ্দিন বলেন, তামাক মানুষের ভাগ্য কেড়ে নিচ্ছে। আগে এখানকার তরিতরকারি পানির দরে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে সরবরাহ হতো। আর এখন চকরিয়া, পেকুয়া থেকে তরিতরকারি, মাছ, মাংস এনে এখানে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাই দামও বেশি পড়ছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, আগে আদিবাসীরা পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করতেন। এখন তাঁরাও জুম বাদ দিয়ে তামাক চাষে ঝুঁকে পড়ছেন। কারণ, ধান বা অন্য কোনো ফসলের চাষ করে আগে একজন চাষি যে পরিমাণ টাকা পেতেন, তামাক চাষে এর দুই-তিনগুণ টাকা পাচ্ছেন তাঁরা। গত বছর লামায় ১০ হাজার একর জমিতে বোরোসহ রবিশস্যের চাষ হয়েছিল। এ বছর পুরো উপজেলার ৪০ হাজার একরের বেশি ফসলি জমি গ্রাস করে নিয়েছে এই বিষাক্ত তামাক।

পৌরসভার মেয়র তাজুল ইসলাম জানান, এই পৌর এলাকায় প্রায় ২০ হাজার একর ফসলি জমি রয়েছে। এ বছর পুরো ২০ হাজার একর জমিতেই তামাক চাষ চলছে। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থাও (এনজিও) ঋণ সুবিধা দিয়ে চাষিদের তামাক চাষে উত্সাহিত করছে। এতে আমাদের কারও কিছু থাকে না।

বান্দরবানের সিভিল সার্জন শরফরাজ খান চৌধুরী জানান, লামায় ব্যাপকভাবে তামাক চাষের কারণে একদিকে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি এলাকায় মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে।

No comments: