Friday, March 12, 2010

সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনায় নতুন ধারা প্রবর্তনের উদ্যোগ

সরকার সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন ধারা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন এই উদ্যোগে সুন্দরবনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীকে বন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত এবং বন থেকে উপার্জিত রাজস্বের একাংশ ওই জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

এ ছাড়া এবারই প্রথম বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ বিখ্যাত এই ম্যানগ্রোভ বনের ‘কার্বন মজুদ’ নির্ণয় করা হচ্ছে। এই মজুদ সংরক্ষণ করে জাতিসংঘের ‘রিডিউসড এমিশন থ্রু ডিফরেস্টেড অ্যান্ড ডিগ্রেডেড ল্যান্ড’ (সংক্ষেপে ‘রিড’) কর্মসূচির আওতায় আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে। এই অর্থ থেকেও সুন্দরবন এবং এর সংলগ্ন অঞ্চলের উন্নয়নে বাড়তি ব্যয়ের সুযোগ থাকবে।

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনসচিব মিহির কান্তি মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, সুন্দরবনের চারপাশের গ্রামবাসীকে এই বনের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই তা কার্যকর করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

দেশের অন্যত্র বন ব্যবস্থাপনায় নিকটবর্তী বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করার কিছু নজির রয়েছে।

কার্বন মজুদ নির্ণয়ের কাজ চলছে জানিয়ে সচিব বলেন, এপ্রিল মাসের মধ্যে তা শেষ হতে পারে। প্রাথমিক হিসাবে এই বনে যে পরিমাণ কার্বন মজুদ রয়েছে, তা সংরক্ষণ করে ‘রিড’ কর্মসূচি থেকে বছরে ৩০ কোটি টাকা পাওয়া যেতে পারে।

কার্বন মজুদ নির্ণয় একটি অপেক্ষাকৃত নতুন বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গৃহীত অন্যতম পন্থা এটি। প্রতিটি বৃক্ষ তার শরীরে কিছু পরিমাণ কার্বন ধারণ করে। একটি বৃক্ষ আগুনে পোড়ালে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, ওই বৃক্ষটি সেই পরিমাণ কার্বন শরীরে ধারণ করে আছে বলে ধরা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো যৌথ বন ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সুন্দরবন সন্নিহিত অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ ঝুঁকি নিয়ে মধু, মাছ ও কাঠ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ ছাড়া প্রত্যক্ষভাবে কোনো সুবিধা পায় না। ফলে অনেকে অসাধু নানা চক্রের সঙ্গে মিলে বনজ সম্পদ ধ্বংসকারী বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ছাড়া বনকর্মীর সীমিত ক্ষমতায় এই বনের টেকসই সংরক্ষণ প্রায় অসম্ভব। এতে আরও বলা হয়, স্থানীয় ব্যক্তিরা বন সংরক্ষণে বন বিভাগ তথা সরকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করতে আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সন্নিহিত ছয়টি উপজেলার ৭৬টি গ্রামের প্রায় দুই লাখ ২৭ হাজার ৭২৭ জনকে বন সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করা যেতে পারে। এ জন্য বনের অপ্রধান বনজদ্রব্যের রাজস্ব আয়ের অংশবিশেষ তাদের মধ্যে বণ্টন করা যায়। আয়ের কিছু অংশ বন সন্নিহিত গ্রামের উন্নয়নকাজ, যেমন—সুপেয় পানি সরবরাহ, সৌর বিদ্যুত্ বিতরণ, বন্য প্রাণী থেকে ক্ষয়ক্ষতির কোনো ঘটনার ক্ষতিপূরণ দেওয়া, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে ব্যয় করা যেতে পারে।

এ ছাড়া বন সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করার লক্ষ্যে প্রতিটি গ্রামে ৮-১০ সদস্যের একটি যৌথ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

কার্বন মজুদ নির্ণয়: মার্কিন বন বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ দল স্থানীয় একটি দলকে কার্বন মজুদ নির্ণয়ের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ওই দলটিই এখন সুন্দরবনের মোট কার্বন মজুদ নির্ণয় করছে।

বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর সমগ্র বনাঞ্চলে মোট কার্বন মজুদের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন টন। এর মধ্যে সুন্দরবনে মজুদ ৩০০ মিলিয়ন (৩০ কোটি) টন। বর্তমানে প্রতিবছর বিভিন্ন উত্স থেকে বায়ুমণ্ডলে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ প্রায় আট বিলিয়ন টন। এর মধ্যে দুই বিলিয়ন টন নির্গত হয় বন ধংসের কারণে। বন সংরক্ষণ করে এই কার্বন নির্গমন রোধ করা সম্ভব। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য ‘রিড’ কর্মসূচিতে আর্থিক সহায়তার সুযোগ রাখা হয়েছে। আর এই সুযোগ পেতে প্রথম কাজ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বনের কার্বন মজুদের পরিমাণ নির্ণয় করা।

No comments: