Monday, January 25, 2010

সুন্দরবনের নাভিশ্বাস

সুন্দরবনের নাভিশ্বাস
খসরু চৌধুরী | তারিখ: ১৪-১০-২০০৯ | প্রথম আলো


বলেশ্বর নদ দিয়ে এসে পশ্চিম দিকের বগির ভারানীতে ঢুকলাম। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর এবং তা থেকে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস এই এলাকার লোকালয় ও সুন্দরবনে সবচেয়ে ভয়ানক আঘাত হেনেছিল। ১৯৮৫ সালেও এই ভারানীতে ট্রলার চলতে অসুবিধা হতো, এখন দোতলা জাহাজ সহজেই চলতে পারছে।

এদিককার জঙ্গলে বন বিভাগ শিলকড়ই, গামারি ও চাপালিশ গাছ লাগিয়েছিল কী এক অজানা কারণে। অনেকগুলোই উপড়ানো অবস্থায় পড়ে আছে। জঙ্গল একেবারে নিঝুম। হঠাত্ কতগুলো মোষ চোখে পড়ল। পশু মারতে বাঘকে প্রলুব্ধ করতে বেআইনিভাবে এগুলো এখানে ঢোকানো হয়েছে। কয়েকটি ঘুঘু আর একটি হক ইগল দেখতে পেলাম।
ভোলা গাঙে পড়ে দূর থেকে জঙ্গল দেখে বিভ্রান্ত হলাম। এদিককার জঙ্গল অনেকটাই সুন্দরীর দখলে। নদীর তটরেখা বরাবর গোলপাতার ঝাড়। দেখলে মনে হয়, জঙ্গল বোধহয় সিডর ও আইলার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠছে।

কাছ থেকে শাপলা খালের জঙ্গল দেখে আঁতকে উঠলাম। বড় গাছগুলোর প্রতিটির মাথা ভাঙা। ভাঙা মাথার আশপাশ দিয়ে নতুন গজানো পত্রপল্লবে কাঠের কঙ্কালের আব্রু ঘুচেছে মাত্র। সুন্দরী, বাইন, কেওড়াই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। গাছের ভেতর যেটুকু প্রাণশক্তি ছিল, তাতেই নতুন কিছু ডালপালা গজিয়েছে ভাঙা মাথার আশপাশে। বনের এই এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের স্রোতের সঙ্গে এসে প্রচুর বালু জমেছে। এই বালিতে শুলো ঢেকে যাওয়ায় গাছগুলো এখন মরতে বসেছে; বিশেষ করে এ এলাকার ৭০ শতাংশ গাছ—সুন্দরীর আগামরা ত্বরান্বিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে পাতা কঙ্কাল করা রোগের সংক্রমণ।

বিগত দেড় শ বছরের ইতিহাসে সুন্দরবন এভাবে পর পর দুটো জলোচ্ছ্বাসের শিকার হয়নি। দুটো জলোচ্ছ্বাসেই পানির স্তর উঁচু হওয়ায় পলি-বালু পড়ে জঙ্গলের উপরিভাগ উঁচু হয়ে গেছে। ফলে পাক্ষিক স্বাভাবিক জোয়ারের পানি আর গাছের গোড়ায় পৌঁছায় না। গাছগুলো মাটির রস শুষেই কোনো রকমে টিকে আছে।

বনে-জঙ্গলে ঘোরাফেরা করলে গাছের ভয়ানক অবস্থা বোঝার জন্য বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। দুরবস্থা প্রকটভাবেই দৃশ্যমান।

জীবজন্তুর অবস্থা বুঝতে শাপলা ক্যাম্পের দুজন বনকর্মী ও একজন জেলের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁরা জানালেন, এদিকটায় একসময় হরিণ আসত, এখন আর আসে না। তবে দিন কয়েক আগে বাঘের হরিণ তাড়া করার শব্দ শুনেছেন তাঁরা রাতের বেলায়।

ক্যাম্পের বনকর্মীদের আবাসঘরটি সিডর ভেঙে ফেলেছে। কাঠামোটি কেবল আছে। ক্যাম্পের সামনেই ছোট্ট একটি পুকুর। এর পানি এখন কোনো রকমে খাওয়া চলে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত পানি সুপতি থেকে আনতে হতো। বনকর্মীরা কিছু পেঁপেগাছ লাগিয়েছেন, তাতে প্রচুর পেঁপে ফলেছে।

সুন্দরবনের শাপলা খাল একসময় কুমিরের জন্য বিখ্যাত ছিল। জেলেরা জানালেন, দু-একটি কুমির এখনো দেখা যায়, তবে সিডরের আগে যে কুমির ছিল, তা এখন আর নেই।

পরের দুই দিন কটিখালী আর কটকার জঙ্গলে ঘোরাফেরা করলাম। ২০ বছরে আমি শতাধিকবার এই এলাকায় এসেছি, জঙ্গলের নানা অংশ আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছি। সিকাডা ফিল্মসের বাঘ খোঁজার অভিযানে বাঘ পর্যবেক্ষণ করতে এই এলাকার এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে যাইনি।

সিডরের পরপর কটকার জামতলা খালে প্রাণী তো দূরের কথা, একটা পাখি পর্যন্ত দেখতে পাইনি। এবার হরিণ খুঁজতে বের হলাম কচিখালী কটকার মাঠে। দু-একটি এলাকায় পাঁচ-সাতটি করে হরিণ এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশির ভাগ মালি হরিণ। কচিখালীতে সার্চলাইটের আলোয় চরের মধ্যে গোটা বারো হরিণ দেখতে পেলাম। কটকার ওয়াচ টাওয়ার থেকে গোটা সাতেক হরিণ ও বাচ্চাওয়ালা একটি শূকর দেখলাম। বিকেলের দিকে চরায় দেখতে পেলাম গোটা দশেক বানর। জানি না, ঝড়ে বানরদের ক্ষতি কম হয়েছে কি না। কারণ সিডরের পরপরই কয়েকটি এলাকায় বেশ কিছু বানর দেখেছিলাম, মনে পড়ছে।

পাখির অবস্থা এখনো সঙ্গিন। সমুদ্র-ইগলদের বাসাগুলো দেখতাম কটকা, ভুলুরদিয়ার চর, ছাপড়াখালির চর এলাকার সাগরপাড়ের কেওড়া গাছে। এই পাখিগুলো একই বাসা বছরের পর বছর ব্যবহার করে। এবার দেখতে পেলাম, তাদের বাসাগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। মাত্র একটি বাসা পেলাম জঙ্গলের অনেকটা ভেতরে।
কটকা কটিখালীর খালগুলোর পাড়ে বাঘের পায়ের ছাপ দেখিনি এমন কখনো হয়নি। এবার অনেক খোঁজাখুঁজির পর পুরোনো পায়ের ছাপ দেখেছি মাত্র।

সিডরের পর প্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বন বিভাগ জানিয়েছিল, পুরো সুন্দরবনে ৩০০ হরিণ ও ঘাঘারামারীতে একটি বাঘ মারা গিয়েছিল।

সিডরের পর পূর্ব সুন্দরবনের একটি বন কার্যালয়ও বসবাসের উপযুক্ত ছিল না। কার্যালয়ের কোনো পুকুরেই পান বা রান্না করার মতো মিষ্ট পানি ছিল না। এ অবস্থায় বন বিভাগের কর্মীরা বনের খালে যেসব প্রাণী মরে আটকে ছিল, সেগুলোই তাঁরা পেয়েছিলেন। এ ছাড়া সাপ, মেছো বিড়াল, চিতা বিড়াল ও পাখি মৃত্যুর ব্যাপারে তাঁরা উদাসীন ছিলেন।
১৯৭০ সালের মহাপ্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসের সাত দিন পর বঙ্গোপসাগর দিয়ে একটি জাহাজ মংলায় এসেছিল। সেই জাহাজের একজন কর্মকর্তার কাছে জেনেছিলাম, বাইরের সাগরে ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে তাঁরা শত শত হরিণের মৃতদেহ দেখতে পেয়েছিলেন।

সুন্দরবনে সিডরের জলোচ্ছ্বাস ছিল সত্তরের জলোচ্ছ্বাসের চেয়ে উঁচু। আইলার জল অনেক দিন স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। আগুয়ান হলে প্রাণী কোনো রকম সাঁতরে কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারে। কিন্তু পানি যখন নেমে যায়, এর বেগ হয় ভয়ানক। সবকিছু ধুয়ে-মুছে বাইরের সমুদ্রে টেনে নিয়ে যায়। জলোচ্ছ্বাসের পরপর সাগর উত্তাল থাকায় কারও পক্ষে ভেসে যাওয়া প্রাণিকুলের সংখ্যা জানা সম্ভব হয় না।

এবার সুন্দরবন দেখে এটাই মনে হলো, পানির টানে হাজার হাজার প্রাণী ভেসে গেছে; বিশেষ করে সাগরপাড়ের জঙ্গলগুলো যে কেউ ঘুরে এলে আমার লেখার সত্যতা বুঝতে পারবেন।

এখানের প্রাণী নিয়ে একটা বিরাট সমস্যা হচ্ছে, সুন্দরবনে কোনো ধরনের প্রাণীর সংখ্যা কত, তা কখনো গোনার চেষ্টা হয়নি। বাঘ গণনার একটি চেষ্টা হয়েছিল, সেটা যদিও যথেষ্ট বৈজ্ঞানিকভাবে অভিজ্ঞ মানুষ দিয়ে করানো হয়নি। তবু বাঘের একটা ধারণামূলক সংখ্যা দাঁড় করানো গেছে। অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা বলা হয় অনুমানের ওপর নির্ভর করে।
দুটি জলোচ্ছ্বাসে ঠিক কতগুলো পশুপাখি মারা গেছে, এর সঠিক হিসাব কারও কাছেই নেই। আমার ধারণা, বনের প্রায় অর্ধেক প্রাণী জলের তোড়ে ভেসে গেছে। আর গাছপালার যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। এ মুহূর্তে তা বোঝা না গেলেও কয়েক বছরের মধ্যে এর ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। সরকার যদিও সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ আংশিক বন্ধ করে দিয়েছে, সেটা প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু সম্পদ আহরণ বন্ধ করাটাই শেষ কর্তব্য নয়। মনে রাখতে হবে, দক্ষিণ বাংলার তিন কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাত্ দেশের এই এক-পঞ্চমাংশ মানুষকে আইনি বা বেআইনিভাবে সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে না আনতে পারলে আগামী ৫০ বছর পর সুন্দরবন থাকবে না।

সুন্দরবনে প্রতিনিয়ত ঝড় বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগমন বার্তা। এ ব্যাপারে আমাদের প্রকৃতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে আবেদন করা দরকার।

No comments: