Saturday, May 30, 2009

দেশে ঢুকছে ১০ হাজার টন বিষাক্ত মাছ ও মুরগির খাবার

আমদানিকারক সিএন্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের যোগসাজশের অভিযোগ

।। চট্টগ্রাম অফিস ।।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির পরেও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা আনুমানিক ১০ হাজার টন মাছ ও মুরগির খাবার ছাড় করার অনুমতি দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। এসব পণ্য দেশের বাজারে ছাড়া হলে মরণব্যাধি ‘ম্যাডকাউ’ রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকায় গত কয়েকমাস এসব পণ্য ছাড় করানো হয়নি। সম্প্রতি আমদানিকারক, সিএন্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে এসব মাছ ও মুরগির খাবার দ্রুত ছাড় করিয়ে নেয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০০৭ সালের ১৬ মে ইন্টারনেটে প্রকাশিত ‘ম্যাডকাউ ডিজিজ এ থ্রেট হেয়ার, এক্সপার্টস সে’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, ম্যাডকাউ রোগের কোনো চিকিৎসা নেই।


উল্লেখ্য, প্রতিটন মাছ ও মুরগির খাবার অর্থাৎ মিট এন্ড বোন মিলের (এমবিএম) দাম ২০০ থেকে ২৫০ ডলার। বাণিজ্যিকভাবে আমদানি করা এই এমবিএম’র শুল্ক হলো ১০ শতাংশ। ম্যাডকাউ রোগমুক্ত এমবিএম এখন আমদানি হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে যার দাম তুলনামূলকভাবে বেশি।

গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক নিরীক্ষা ও পরিদর্শন শাখার দ্বিতীয় সচিব জুয়েল আহমেদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনারকে বলা হয়েছিল, একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তার দপ্তর প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিচ্ছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সদ্য বিদায়ী কমিশনার (আমদানি) শাহ আলম খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘ভিয়েতনাম ও চীন থেকে এসব খাবার অনুপযোগী বলে ফেরত দেয়ার পর একই পণ্য বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে বলে মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর এবং পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে আমি প্রায় ৫০০ কন্টেইনার এমবিএম ছাড়করণের অনুমতি দেইনি এতদিন।’ একই বিষয়ে নবনিযুক্ত কমিশনার সৈয়দ গোলাম কিবরিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমদানি নীতিতে কোন্ পণ্য ছাড় করানো যাবে কিনা সেই নির্দেশনা দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলে দ্রুত এসআরও জারি করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ঐ মন্ত্রণালয়। এমবিএম’র (মিট এন্ড বোন মিল) ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় সেগুলো ছাড় করার অনুমতি দেয়া হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাবিশ্বে গুঁড়ো দুধে ক্ষতিকারক মেলামাইন পাওয়ার পর চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তৎকালীন কমিশনার শাহ আলম খান ‘সুইট বেবী’ ও ‘ইয়াসলি’র মতো বেবী ফুড ছাড়করণ বন্ধ করে দেন। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশনা ছিল না। এরপর সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সভা করে খালাস বন্ধ করার জন্য নির্দেশ জারি করে। আটক করা এসব মিট এন্ড বোন মিল আদালতের নির্দেশে ছাড় করা হয়েছে বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা এখন অজুহাত দিচ্ছেন। আদালতের নির্দেশের বিরুদ্ধে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কেন আপীল করেনি সেটি এক বড় প্রশ্ন। কারণ কয়েকদিন আগে রড আমদানিকারকদের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে পাল্টা আপীল করে ক্যাশ ও ব্যাংক গ্যারান্টিসহ প্রায় ১৮ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছিল এ কাস্টমস হাউস।

মৎস্য ও পোল্ট্রি ফার্মের অর্গানিক সার হিসাবে ব্যবহৃত এই এমবিএম চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় করা হলেও দেশব্যাপী এখনো বিতরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিকৃত এসব এমবিএম রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া বাজারজাত করলে দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। যদিও ইতিপূর্বে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের গবেষণাগারে এ পর্যন্ত

২০০০ গবাদিপশুর মস্তক পরীক্ষা করে এ রোগের কোনো আলামত পায়নি। তবে আক্রান্ত কোনো দেশ হতে মিট এন্ড বোন মিল আমদানির মাধ্যমে দেশে এ রোগ বিস্তারে যথেষ্ট আশংকা রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন আমদানিকারক ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, ইতালী থেকে এসব মুরগী ও মাছের খাবার আমদানি করে। আর এসব খাবার ছাড় না করার জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে লিখিত চিঠি দিয়েছে মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব জে আর শাহরিয়ার। গত ২০০৮ সালের ৭ মে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে প্রেরিত এ চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশকে রোগমুক্ত রাখার জন্য পশুসম্পদ অধিদপ্তরের পূর্ব অনুমতি ব্যতিরেকে আমদানিকারকগণ যেন বিদেশ থেকে শুল্ক প্রদানপূর্বক কোনো প্রকার ‘মিট এন্ড বোন মিল’ আমদানি করতে না পারে। এ চিঠির ভিত্তিতে দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে কাস্টমস কমিশনার শাহ আলম খান পশুসম্পদ অধিদপ্তরের প্রত্যয়নপত্র, পণ্য চালান মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি কিনা ও হেলথ সার্টিফিকেট ও সার্টিফিকেট অব অরজিন সঠিক কিনা ইত্যাদি বিষয়ে তদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার নির্দেশ দেন। কিন্তু বর্তমান কমিশনার সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া যোগদান করার চারদিনের মাথায় এসব চালানের পণ্য দ্রুত খালাসের নির্দেশ দেন।

গত ২০০৮ সালের ১৬ এপ্রিল চিংড়ি রপ্তানিকারক মুজিবুর রহমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগে তুলে ধরেন যে, ‘মিট এন্ড বোন মিল’ যাহা মানবদেহের জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর বিশ্বের বহু দেশে পোল্ট্রি ও মৎস্য খাদ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ সেসব পণ্য মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করলে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হবে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বাংলাদেশ হতে চিংড়ি রপ্তানি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে দিবে। এতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাবে।

No comments: