Friday, May 29, 2009

পরিবেশ তথা অর্থনীতিতে টিপাইমুখ ড্যামের বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা

মারুফ মল্লিক (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদক)

ঢাকা, মে ২৮ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)--ভারতের টিপাইমুখে ড্যাম নির্মাণ ও কাছাকাছি ফুলেরটালে ব্যারেজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করা হলে তা বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট নদীর পানি প্রবাহে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের আশঙ্কা, এর ফলে পরিবেশ, কৃষি উৎপাদন ও নাব্যতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে যা নতুন দারিদ্র্য সৃষ্টি করতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশনের সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ইনামুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের জানা তথ্যমতে সিলেটের জকিগঞ্জের অমলসীদ সীমান্ত থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে জলাধার নির্মাণের জন্য টিপাইমুখে ড্যাম তৈরি করা হবে। জলাধারের পানি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। বরাক, টিপাই ও ইরাং এ তিনটি নদী থেকে পানি নিয়ে বিশাল এলাকা নিয়ে ওই জলাধার নির্মাণ করতে হবে বলে তিনি জানান।

প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, এছাড়াও বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে ভারতের ফুলেরটাল এলাকায় ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষিতে সেচ দেওয়ার জন্য পানি খালের মাধ্যমে প্রবাহিত করা হবে।

ইনামুলের মতে, "শুধু ড্যাম হলে পানির স্তর ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু ব্যারেজ হলে পুরোটাই ওদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।"

এ প্রকৌশলীর পর্যবেক্ষণ, এর ফলে ভাটিতে দুটো প্রতিক্রিয়া হবে। একটি হচ্ছে ডিসেম্বর থেকে পানি কমে এলে বাংলাদেশের হাওর এলাকায় যে জমি জেগে ওঠতো তা আর হবে না। এতে করে ডিসেম্বর থেকে ফেব্র"য়ারি পর্যন্ত ওই এলাকার জনসাধারণ যে আগাম বোরো চাষ করতো তা আর পারবে না।

আবার এর পর পরই মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত ওই এলাকায় পানির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে আসবে। ইনামুল হক জানান, কুশিয়ারার পানি ২০ ভাগ কমে আসবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ ভারত ওই সময় নিজেদের কৃষির জন্য পানি প্রত্যাহার করে নেবে।

আইইউসিএন এর আবাসিক প্রতিনিধি পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টিপাইমুখে ড্যাম তৈরি করা হলে প্রথম বর্ষায় বন্যার প্রকোপ কিছুটা কমবে। বর্ষার শেষ দিকে বন্যার আশংকা বাড়বে। আবার শুষ্ক মওসুমে পানির প্রবাহ বাড়ার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি বলেন, ভারত টিপাইমুখে ড্যাম তৈরির পর ফুলেরটালে ব্যারেজ নির্মাণ করতে পারে। এ ব্যারেজের মাধ্যমে তারা পানি প্রত্যাহার করতে পারে। তাতে বর্ষায় সুরমা-কুশিয়ারার পানির প্রবাহ অপরিবর্তিত থাকলেও শুষ্ক মওসুমে প্রত্যাহারের কারণে প্রবাহ কমতে পারে।

আইনুন নিশাত বলেন, "প্রবাহ কতোটা কমবে তা নির্ভর করবে যে খালের মাধ্যমে পানি প্রত্যাহার করা হবে তার ক্ষমতার ওপর। ক্ষমতা বেশি হলে শুষ্ক মওসুমে সুরমা-কুশিয়ারা একেবারে শুকিয়ে গেলেও বিস্মিত হবো না। এর প্রভাব চাঁদপুর পর্যন্ত পড়তে পারে।"

ইন্সটিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এর এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ করা হলে অমলসীদে সুরমা ও কুশিয়ারার উৎসস্থলে জুলাই মাসে পানির স্তর এক মিটার নেমে যাবে। এতে ভাটিতে ভাঙন বেড়ে যাবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এতে করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে। আবাদী জমি হ্রাস পাবে। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান কমবে। বিপরীতে দারিদ্র্য বাড়বে।

ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, ভারতের মনিপুর রাজ্যের টিপাইমুখে বরাক নদীতে ১৬২ দশমিক ৫ মিটার উঁচু ও ৩৯০ মিটার দীর্ঘ এ বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এ থেকে প্রায় ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে ভারতের। এতে সেখানে প্রায় ২৭৫ দশমিক ৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা স্থায়ীভাবে প্লাবিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের মণিপুর পর্বতমালায় জন্ম নেওয়া বরাক নদী সুরমা-মেঘনা নদী ব্যবস্থার অংশ। এটি মনিপুর, মিজোরাম ও আসাম রাজ্য হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

বাংলাদেশের পরিবেশবাদী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিশেষজ্ঞদের অনেকে ভারতের এ বাঁধ প্রকল্পের সমালোচনা করে তা বন্ধের ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছেন।

গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতীয় হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী তার সঙ্গে দেখা করার সময় জানান, একটি সর্বদলীয় সংসদীয় দল প্রকল্প দেখে এসে তাদের মত দেওয়ার পরই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এর প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, সংসদীয় নয় , এ কাজটির জন্য পাঠানো উচিত দুদেশের যৌথ বিশেষজ্ঞ দল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এমআরএফ/এসকে/২০৩৩ঘ.

No comments: