Wednesday, April 1, 2009

বুড়িগঙ্গার তলদেশে ১০ ফুট পলিথিনের স্তর!

বুড়িগঙ্গার তলদেশে ১০ ফুট পলিথিনের স্তর!
অরূপ দত্ত ২০০৯-৪-২

ঢাকার সদরঘাটসহ আশপাশের এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে প্রায় ১০ ফুট পলিথিনের স্তর পড়েছে। বিশেষ করে কামরাঙ্গীরচর থেকে বাদামতলী পর্যন্ত এই পলিথিন বর্জ্য সবচেয়ে বেশি। অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কামরাঙ্গীরচর ও নবাবগঞ্জ এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর পারে পলিথিন ব্যাগ শুকানো হচ্ছে। ব্যবহূত এসব পলিথিন নদীতে ধুয়ে পারে শুকাতে দেওয়া হয়। ধোয়া ও শুকানোর প্রক্রিয়ায় অনেক পলিথিন নদীতে পড়ে। দ্বিতীয়বার ব্যবহারের অযোগ্য পলিথিনগুলোও নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এই করে বছরের পর বছর বুড়িগঙ্গায় জমছে পলিথিনের স্তর।
শুধু ধুয়ে-মুছে শুকানো পুরোনো পলিথিন আবার চলে যায় কঁাঁচাবাজারে, মনিহারি আর পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানে। সেখান থেকে এগুলো আবার চলে যায় নগরবাসীর বাসাবাড়িতে। এ কারণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

শুধু ব্যবহূত নয়, নতুন পলিথিনও স্তুপ করে রাখা আছে বুড়িগঙ্গার পারে। পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও এই বুড়িগঙ্গার পারেই ছোট ছোট কারখানায় পলিথিন উৎপাদন হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ সুত্র জানায়, ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) ময়লাবাহী গাড়ি নদীর পারে পলিথিনসহ গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলে। সে বর্জ্যরে গন্তব্যও নদী। পচনশীল নয় বলে দীর্ঘদিন ধরে জমতে জমতে সেই বর্জ্য এখন নদীর পারে ও তলদেশে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া নালা-নর্দমা ধরে আসা পলিথিনও নদীর তলদেশ ভারী করে তুলছে।

সম্প্রতি কামরাঙ্গীর চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গার পারে প্রায় ৩০ জন মহিলা পলিথিন শুকানোর কাজে ব্যস্ত। ছমিরন বেগম নামের একজন মহিলা জানান, ১০০ বড় পলিথিন শুকালে তাঁরা পাঁচ টাকা পান। নদীর পারেই পলিথিনের অন্তত আটটি দোকান বা গুদাম আছে। শুকানোর পর সেখানে জড়ো করা হচ্ছে এসব পলিথিন। একটি গুদামের কর্মচারী আবদুর রহমান জানান, তিনি ছোট চাকরি করেন। পলিথিন কোথায় যায় না-যায়, এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

২০০৬ সালের শেষ দিকে পলিথিন বর্জ্যরে বিশাল স্তরের হিসাব পায় বিআইডব্লিউটিএ। বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান সুনীল বোস প্রথম আলোকে বলেছিলেন, সাধারণ মেশিনে এই বর্জ্য কাটা সম্ভব নয়। বিদেশ থেকে বিশেষ ‘কাটার মেশিন’ আমদানি করে এসব বর্জ্য অপসারণ করতে হবে।

কিন্তু এত বছরেও সেই ‘বিশেষ যন্ত্র’ আসেনি। বিআইডব্লিউটিএর বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান হাওলাদারের কাছে গত শনিবার জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, কাটার মেশিন কেনার বিষয়টি তিনি আসার আগেই সম্ভবত চাপা পড়ে গিয়ে থাকবে। তবে কামরাঙ্গীর চর এলাকায় নদী খনন করার একটি প্রকল্প তাঁদের রয়েছে। সে অনুযায়ী কাজ করা হবে। এ ছাড়া অন্য কী উপায়ে বিষয়টির সমাধান সম্ভব, তা নিয়ে তাঁরা চিন্তা-ভাবনা করছেন। তবে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নদী দুষণমুক্ত করা অসম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

বুড়িগঙ্গা দখল ও দুষণ রোধে আন্তমন্ত্রণালয় ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স ২০০২ সালের অক্টোবরে ১৭ দফা সুপারিশ তৈরি করেছিল। সুপারিশের একটি ছিল বুড়িগঙ্গার তলদেশে জমাকৃত আবর্জনা ও পলিথিন অপসারণ।

টাস্কফোর্সের অন্যতম সদস্য পরিবেশবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘১৭ দফা সুপারিশে পলিথিন অপসারণের বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল। এখন আমরা যে বিষয়টি ভাবছি তা হচ্ছে, পলিথিনসহ যেকোনো বর্জ্য যাতে নদীতে পড়তে না পারে, তার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কমপক্ষে তিনটি সার্বক্ষণিক ভ্রাম্যমাণ দল গঠন করা। কারা বর্জ্য ফেলছে, কীভাবে ফেলছে−এরা তা পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি করবে। এই দলে র‌্যাব, পুলিশকেও রাখা যায়। প্রয়োজনে ছয় মাস অন্তর দল পুনর্গঠন করতে হবে।’

জনজীবন ও পরিবেশ সংরক্ষণের স্বার্থে সরকার ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫’-এর আওতায় ২০০২ সালের শুরুতে পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ১০ বছরের কারাদন্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হলেও আইন প্রয়োগের অভাবে এক বছরের মাথায় পলিথিন উৎপাদন বিক্রি ও ব্যবহার শুরু হয়ে যায়।

সম্প্রতি প্রথম আলোয় নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন বিপণন নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে সরকার এর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। ১৯ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ১ নম্বরের হজরত শাহ আলী মার্কেটের দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। চট্টগ্রাম, পাবনাসহ সারা দেশে পলিথিনের বিরুদ্ধে অভিযান চলে কয়েক দিন। কিন্তু বুড়িগঙ্গাপারের এই পলিথিন ব্যবসায় এর কোনো আঁচ লাগেনি।

No comments: