Tuesday, February 24, 2009

সুন্দরবন বাঁচাতে গবেষণা

উষ্ণায়ন মোকাবেলায় বনাঞ্চলকে বর্ধিত কার্বনসহিষ্ণু করার জন্য আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে ইউএসডিএ

।। রেজাউল করিম, খুলনা অফিস ।।

বিশ্বখ্যাত সুন্দরবনের বৃক্ষরাজীকে অধিকতর কার্বন ও লবণাক্ত সহিষ্ণু করে তোলার উপায় খুঁজছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) গবেষকরা। বায়ু মন্ডলে বর্তমান কার্বনের পরিমাণ যদি দ্বিগুণও বৃদ্ধি পায় কিংবা সমুদ্র উপকূলে লবণাক্ততা অস্বাভাবিক হারে বাড়ে, সেই পরিবেশে ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যাবে তা নিয়েই হচ্ছে এ গবেষণার কাজ।

যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের (ইউএসডিএ) আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সম্প্রতি এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছে। খুবি’র ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে বড় ধরনের গবেষণা।

উক্ত প্রকল্প দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনসহ কৃষি এবং এ অঞ্চলের জলবায়ুগত পরিবর্তনের নিরীখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে গৃহীত গবেষণার মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সম্ভাব্য উপায় নির্ণীত হলে তা আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষেত্রে অনেক বড় ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, শিল্প বিপ্লবের কারণে বায়ুমন্ডলে কার্বনডাই অক্্রাইডের (কার্বন) পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২০০২ সাল পর্যন্ত কার্বনের পরিমাণ বেড়েছে ২৯০ পিপিএম থেকে ৩৭০ পিপিএম। এ পরিবর্তন গত সাড়ে ১২ হাজার বছরের পরিবর্তনের হারের তুলনায় অনেক বেশি। গবেষকরা মনে করছেন, বর্তমান শতাব্দির শেষ নাগাদ কার্বনের পরিমাণ ৫০০ পিপিএম থেকে ১০০০ পিপিএম পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। কার্বনডাই অক্সাইড একটি গ্রীন হাউজ গ্যাস যার বৃদ্ধি বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করছে। অন্যদিকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততাও ক্রমে ক্রমে বাড়ছে। এ অবস্থা ঠেকাতে জীববিজ্ঞান সমন্বয়ক কিছু প্রকৌশলগত পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ম্যানগ্রোভ প্রজাতির বনই হতে পারে এর মোক্ষম ক্ষেত্র।

আমাদের দেশের বিশ্বখ্যাত ৬০ মাইল দীর্ঘ সুন্দরবনের বনরাজিকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায় তার একটি বৈজ্ঞানিক উপায় খুঁজে বের করার জন্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেষ্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন বিষয়টি নিয়ে একটি প্রজেক্ট প্রোফাইল তৈরি করেন। প্রকল্প প্রোফাইলের শিরোনাম হচ্ছে ‘সুন্দরবনের প্রধান কাষ্ঠল প্রজাতির বৃক্ষের কার্বন সঞ্চিতকরণ ও লবণাক্ততা সহিষ্ণু ক্ষমতার সাথে তার বৃদ্ধি এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এসব প্রজাতির বনায়নের সম্ভাবতা যাচাই।’ এ প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয় দেড় কোটি টাকা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য ও বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর ড. মোঃ সাইফুদ্দিন শাহ্ বিষয়বস্তু নির্বাচনের পাশাপাশি এ কাজে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।

একই ক্ষেত্রে আরো একটি গবেষণার কাজ হাতে নিয়েছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ মনিরুল ইসলাম। টিস্যু কালচার পদ্ধতির মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট সুন্দরবনের দুইটি বিলুপ্ত প্রায় উদ্ভিদ প্রজাতির পশুর ও ধুন্দলের বংশবিস্তার, সংরক্ষণ ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে তাদের পুনঃসঞ্জীবনীকরণ কীভাবে করা যায় তা নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন। কারণ সুন্দরবনে সুন্দরী, পশুর, ধুন্দল, গ্যাওয়া, গরান, বাইন, কেওড়া, ঝানা, সিংড়া, আমুর, গোলপাতাসহ অস্যংখ্য প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। এর মধ্যে অত্যন্ত মূল্যবান অথচ বিপন্ন প্রায় উদ্ভিদের তালিকায় পশুর ও ধুন্দলের নাম রয়েছে। এ প্রজাতি দুইটি এক সময় সুন্দরবনে বিপুল পরিমাণে দেখা গেলেও বর্তমানে এর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আইইউসিএন-এর আশঙ্কাজনক বৃক্ষের তালিকায় বাংলাদেশের সুন্দরবনের ধুন্দল ও পশুর এ দুই প্রজাতির বৃক্ষের নাম রয়েছে। বিশ্ব ঐতিহ্য আমাদের সুন্দরবনের এ দুইটি বৃক্ষ প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা এবং বংশ বৃদ্ধির উদ্দেশ্য নিয়ে এ গবেষণার কাজ করা হচ্ছে। এ গবেষণা প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

No comments: