Sunday, June 8, 2008

অরণ্যের জন্য অরণ্য রোদন

বিপ্রদাশ বড়য়া

গত বছর সরকারীভাবে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি শুরু হয়েছিল শ্রাবণ মাসে। এ বছর সঠিক সময়ে জ্যৈষ্ঠ মাসে শুরু হয়েছে। খনার বচনেও আছে, ‘বাগান করে শ্রাবণে, ডাকি কয় রাবণে, রুইব জনে পাইব না, অন্য জনে খাইব না।’ অর্থাৎ শ্রাবণে বাগান করলে বাগানের মৃত্যু ও বাগানবাড়ীর অর্থনৈতিক দুর্ভোগ অনিবার্য।

জ্যৈষ্ঠ মাসের তাপ নতুন চারার জন্য একটু ক্ষতিকর হলেও এসময়ের মাঝে মাঝে অনিয়মিত অল্প বৃষ্টিও নতুন চারার জন্য উপকারী। সামনে আষাঢ় ও শ্রাবণের প্রবল বৃষ্টির আগেই নতুন চারা শেকড় বের করে বৃষ্টি সহনশীল হয়ে ওঠে।

আবার কিছু কিছু গাছ আছে যাদের মাঘ-ফাল্গুন মাসে রোয়া উচিত। ঘর, বাগান ও জমির সীমায় জিগা, মাদার প্রভৃতি মাঘ-ফাল্গুনে রোয়া উত্তম। শীতে সব গাছেরই বিশ্রামের কাল, এজন্য এসময় বাগান করা হয় না। বসন্তে কলাগাছ, গুলাচি, পেঁপে ইত্যাদির বাগান করেন গ্রামের মানুষ। এসময় বা গ্রীষ্মের আগে পাট, শুকনো মরশুমের ধান রোয়ার উত্তম সময়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড খরায় মাটির সামান্য রসই গাছের জন্য যথেষ্ট। এসময় সকল গাছ কচি পাতা বের করে তাজা হয়ে ওঠে-প্রকৃতির এই পাঠ মানুষ লক্ষ্য করেছে। বসন্ত থেকে গ্রীষ্মে প্রকৃতিতে চলে সৃজন উদ্যোগ। গাছপালা, পশুপাখি সৃষ্টিকর্মে উদ্যমী হয়ে ওঠে-এই শিক্ষা মানুষ পেয়েছে প্রকৃতি থেকে।

বৃক্ষ রোপণ পক্ষ বা মাস যত জাঁকজমক করে করা হয় বিগত বছরগুলোতে রোয়া গাছের যতœ সেভাবে নেয়া হয় না। বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গে এজন্য পূর্ববর্তী বছরগুলোয় রোয়া গাছগুলোর পরিচর্যার জন্য আর্থিক বাজেট বরাদ্দ করা অত্যন্ত জরুরী। তার উপর শহর অঞ্চলে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচি যত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে নেয়া হয় গ্রামাঞ্চলে সে রকম উদ্যোগ দেখা যায় না। মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা সরকারী কর্মকর্তার গাড়ির তেল পুড়ে পরিবেশ দূষণ করে, মাইক বাজিয়ে যে অনাচার করে থাকে তা গর্হিত অন্যায়ের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু এ কথা তারা শুনবেই না।

শহর অঞ্চলে গাছের উপর গাছ রোয়ার যে নজির লক্ষ্য করা যায় তার সিকিভাগও যদি অরণ্য সৃষ্টির জন্য নেয়া হত তা হলে এতদিনে দেশে অরণ্যের ভাগ মোট ভূখন্ডের ৮% (শতকরা ৮ ভাগ) কখনও হতে পারত না। অথচ ১৯৭১ সালেও দেশে অরণ্যের ভাগ ছিল কমবেশি ৩০%।

সামাজিক বনায়ন ও ইকো পার্ক নামে দুটি দুর্যোগ আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। সামাজিক বনায়নের নামে মধুপুর গড়ের শাল অরণ্য সাফ করে আনারস, ইউক্যালিপটাস, সোনাঝুরি (অ্যাকাশিয়া মনোলিফর্মিস) প্রভৃতির চাষ হচ্ছে। ইকো পার্কের নামে অরণ্যের বন্ধু আদিবাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। চাষবাসের নামে সুন্দরবনের উত্তর ও পূর্বদিকে দিন দিন অরণ্য ছোট করে ফেলা হচ্ছে।

কর্ণফুলী কাগজ কলের বাঁশের জন্য স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও অরণ্যে বাঁশের চাষ হত নিয়মিত। এখন কাগজের কল ও গৃহস্থালির কাজের জন্য বাঁশ সংগ্রহ করতে হয় গভীর অরণ্য থেকে। নতুন নতুন বাঁশের অরণ্য সৃষ্টি এখন স্মৃতি মাত্র। গত দশ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্য দেখে দেখে আমার ধারণা হয়েছে যে সরকারী উদ্যোগে অরণ্য ধ্বংস করাই যেন সরকারের দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। ঠিক যেমন পুকুর ও জলাশয় ভরাট করার সরকারী আইন অমান্য করে ঢাকা নগরীর নদী, পুকুর ও ঝিল অনবরত ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার আগের দু’বছরের মধ্যে সরকার নিজের আইন অমান্য করে বাসাবো, খিলগাঁও, রাজারবাগ এলাকায় যে পরিমাণ পুকুর ও ঝিল ভরাট করেছে তার নজির মেলা ভার। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুকুর, ঢাকা স্টেশনের পুব দিকে রেলের ঝিল, আহমদবাগ-বাসাবো এলাকার রেলের ঝিল আলাদীনের জাদুর মতো চুরি হয়ে গেল। পুলিশ লাইনের পুকুরে বর্তমানে গাড়ির পার্ক হয়েছে। রেলওয়ের ঝিল দুটিতে হাসপাতাল বা কম্যুনিটি সেন্টার হচ্ছে। খিলগাঁও-এর বিখ্যাত পুকুর হয়ে গেছে আপাতত খেলার মাঠ। ঢাকার মাটির নিচের জলের স্তরে শুকনো মরশুমে জল পাওয়া যায় না- এসবের কারণ কেউ খুঁজে দেখে না।

ঢাকঢোলও পেটানোর দরকার আছে। বৃক্ষরোপণ নিয়ে এই প্রচারের ফলে সারা দেশে গাছ রোয়া হচ্ছে প্রচুর। দ্রুতবর্ধনশীল মেহগনি এখন গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। এই মেহগনি ও গামারি কুড়ি-পঁচিশ বছরে ৩৬ ইঞ্চি বেড়ের গাছ হয়ে ওঠে। গ্রাম-গঞ্জের করাত কলগুলোতে এদের দেখা পাবেন। জাতীয় সড়কগুলোর আশেপাশের করাতকলে এদের স্তূপ দেখবেন। বাংলাদেশের আনাচ-কানাচ ঘুরে দেখেছি কুড়ি-তিরিশ বছুরে গাছের তারুণ্য। এমনকি শহরেও আজকাল আমার বয়েসী গাছ দেখতে পাই না। গ্রামের গরিব মানুষ গাছ বিক্রি করবেই, তাদের ভাত-কাপড় সংগ্রহ, ছেলের পড়া, মেয়ের বিয়েতে টাকার দরকার হয়। তখন হয় জমি বন্ধক, গরু বেচা, নয়তো গাছ বিক্রিই একমাত্র উপায়। এমনকি তাল, শিমুল, বট, অশ্বত্থও আর চল্লিশ বছর পার হতে পারে না। গ্রামের শতবর্ষী প্রাচীন বটগাছ, হাট-বাজারের অশ্বত্থ ও বৃষ্টি শিরীষগুলো কোথায় গেছে? আপনারা জানেন কি? আমি জানি।

ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় সড়ক, যশোর রোড, এমনকি রাজশাহীর আমবাগানে যাওয়ার সময় ছোট সড়কগুলোর ধারে দেখেছি গাছের গায়ের চামড়া কেটে রক্ত দিয়ে নম্বর বসিয়ে বৃক্ষ গণনা করা হয়েছে। এই বৃক্ষ শুমারি করেছে খোদ সরকারী বন দপ্তর। এমনকি যশোর রোডের শতবর্ষী বৃষ্টিশিরীষ (এন্টারোলোবিয়াম সামান) গাছের গায়ে সেই কবেকার বৃক্ষশুমারিতে যে ক্ষত হয়েছে তা আজও সেই ক্ষতিকর ক্ষতই হয়ে আছে। বৃক্ষশুমারির নামে এই ক্ষমাহীন মূর্খতা কবে ঘুচবে? মূর্খ বন ও পরিবেশ মন্ত্রী কখনও কি পথ চলতে চলতেও এসব দৃশ্য দেখে না। আমাকে নোয়াখালীর মহীপালের এক স্কুল বালক এই ক্ষত ও বৃক্ষশুমারি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল। আমি ভদ্রতা করেও বন ও পরিবেশ দফতরের কর্তা ও মন্ত্রীদের রক্ষা করে কিছু বলতে পারিনি।

সামাজিক বনায়নের নামে মধুপুর-ভাওয়াল গড়ের শালবনের (আসলে গজারী বন) আজ দফারফা। এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সেমিনার, ডকুমেন্টারী ও বই রচনা থেকে যে চিত্র শহরবাসী পেয়েছেন তা ভয়াবহ বললেও কম বলা হয়। আপনি গাজিপুর হয়ে টাঙ্গাইল যাওয়ার পথে সামাজিক বনায়নের নামে অনেক সাইনবোর্ড দেখতে পাবেন। মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা এসব দেখতে পায় না, যদি পেত ‘সামাজিক বনায়ন’ নামে বন লোপাট করার আইনটি তক্ষুণি বন্ধ হয়ে যেত। যেত তাও বলি কী করে? নদী, পুকুর, ঝিল, হাওর ভরাট করাও তো আইনে নিষিদ্ধ। কিন্তু আইনের প্রয়োগ কই? জরুরী আইনও তো এখন দেশে রয়েছে, কিন্তু বায়তুল মোকাররমে তো সভা ও সরকার বিরোধী মিছিল হয়, চাল-ডালের দামও কেবল বাড়তেই থাকে, পোশাক শিল্প কারখানায় হরদম মিছিল-অশান্তি-আগুন লেগেই আছে! আর আমি বলছি বৃক্ষরোপণ ও বন নিধনের কথা। এসব কি অরণ্য রোদনের পর্যায়ে পড়ে না? আপনারা বলুন।

অচিরে জেলায় জেলায় বৃক্ষমেলা শুরু হবে, রাস্তার ধারে, গাছের গায়ে গাছ রোয়া হবে, আগ্রাসী করাতকলে কুড়ি-পঁচিশ বছুরে গাছে হরদম চেরাই হবে, বিগত বছরগুলোতে রোয়া গাছগুলোর যতœ নেয়ার কোনো উদ্যোগ বা পরিকল্পনা নেয়া হবে না, বৃক্ষশুমারির নামে গাছের গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করে গাছের ক্ষতি হতেই থাকবে। তাহলে দেশের জন্য অপরিহার্য ৩০% অরণ্য সৃষ্টির স্বপ্ন কি অরণ্য রোদনই থেকে যাবে বলব না?

No comments: